:: কাজী পারভেজ ::
পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের মতোই বাংলাদেশেও সুফিবাদের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন। বলা হয়ে থাকে, বিশ্বজুড়ে সুফিবাদের যে পাঁচটি প্রধান কেন্দ্র রয়েছে, তার মধ্যে ভারত অন্যতম। বাকি চারটি হলো পারস্য (মধ্য এশিয়াসহ), বাগদাদ, সিরিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা। হিন্দুস্তানের মাটিতে সুফি সাধকেরা ইসলামের যে মরমী ও উদার শিক্ষার প্রচার করেছিলেন, তা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সহজেই জায়গা করে নেয়। বাংলাদেশে এই সুফি ধারাকে অনেকেই ‘পীরবাদ’ বা আউলিয়া সংস্কৃতি নামে চেনেন।
বাংলার স্থানীয় মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির ওপর সুফিবাদের প্রভাব ছিল অপরিসীম। এই সুফি সাধকদের উদারতা, মানবপ্রেম ও আধ্যাত্মিক চেতনার প্রভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশে দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। ত্রয়োদশ শতক থেকে শুরু করে শত শত বছর ধরে সুফি পীরেরা গ্রামগঞ্জে ঘুরে ঘুরে ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সুফিদের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মূল উৎস মনে করেন এবং তাঁদের খানকাহ ও দরগাহগুলোকে সমাজ ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গণ্য করেন।
সুফিবাদ মূলত একটি আত্মিক অধ্যায়, যেখানে আত্মার পরিশুদ্ধিই প্রধান বিষয়। সুফি দর্শনের মূল কথা হলো, আপন নফস বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া এবং জীবাত্মাকে পরমাত্মার (আল্লাহর) অধীন করা। শয়তানের প্ররোচনা ও জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত হয়ে স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করাই এই দর্শনের মর্মকথা। স্রষ্টা ও সৃষ্টির এই নিবিড় আধ্যাত্মিক সম্পর্ককে জানার প্রচেষ্টাই হলো সুফিবাদ। অন্যায় ও পাপের ওপর আন্তরিক অনুশোচনা, অন্যায়ের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে তা না করার দৃঢ় শপথ অর্থাৎ ‘তাওবা’ হলো সুফি মতবাদের প্রথম মূলনীতি। বিখ্যাত সুফি সাধক নিজামুদ্দীন আউলিয়া বলেছিলেন: “স্বল্প আহার, স্বল্প কথন, স্বল্প মেলামেশা এবং স্বল্প নিদ্রার মধ্যেই নিহিত আছে মানুষের পূর্ণতা।” সব অবস্থায় আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া, গুরুর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া এবং নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জীবন পরিচালনা করাই এই পথের মূল শিক্ষা।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বর্তমান বাংলাদেশে সুফি ও মাজার সংস্কৃতি বারবার উগ্রবাদীদের ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এটি মূলত উদারপন্থী, সংখ্যালঘু ও মুক্তমনাদের ওপর চালানো উগ্রবাদী সহিংসতারই অংশ। অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ব আউলিয়াভিত্তিক সংস্কৃতিতে গান বাজনা, উৎসব, মেলা এবং একটি সুন্দর লোকজ মেলবন্ধন ছিল।
এই সুফি ধারারই একজন প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব হলেন দেওয়ানবাগী পীর (সৈয়দ মাহবুব এ খোদা)। আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি দেশের জন্য তাঁর অবদানও অনস্বীকার্য। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল তিনি ৭২ জন স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ৩ নং সেক্টরের অধীনে কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন ফ্রন্টে সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। পরবর্তীতে ভারতের হেজামুরায় ৩ নং সেক্টরের সদর দফতরে মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং ঈদুল ফিতরের নামাজের ইমামতি করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মুক্তিযোদ্ধাদের ঐতিহাসিক ঈদুল আজহার নামাজেও তিনি ইমামতি করেছিলেন।
তাঁর মহান আদর্শ ও মোর্শেদ প্রেমের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ৯ বছর বয়সে মোহাম্মদী ইসলামের এই সুফি ধারায় আমার পথ চলা শুরু হয়। তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। স্বার্থান্বেষী একটি মহল বারবার আমার অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। দেওয়ানবাগী হুজুরের জীবদ্দশাতেই আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। দেশ ও বিদেশে (যেমন সৌদি আরবে) সুফি আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে চরমপন্থী ও কট্টরপন্থীদের চক্রান্তে আমাকে অমানবিক নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বাংলার মাটিতে দ্বাদশ শতাব্দীতে বৌদ্ধ পাল সাম্রাজ্যের সময় থেকেই সুফিদের আগমন ঘটেছিল। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা সিলেটের সুফি সাধকদের প্রভাবের কথা তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন। ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন দেখিয়েছেন কীভাবে সুফি শিক্ষকেরা তাঁদের অনন্য আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব দিয়ে বাংলার মানুষকে মোহিত করেছিলেন। তাই বর্তমান সময়ে এসে যারা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সুফি পীরদের মাজার ও আস্তানায় ভাঙচুর চালাচ্ছে, তারা মূলত ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার শত্রু। শাহজালাল ও শাহপরান (রহ.) সহ ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি এই বাংলাদেশে যারা সুফিবাদের বিরোধিতা করে মাজার সংস্কৃতিতে হামলা চালায়, তারা প্রকৃত ইসলামে বিশ্বাসী নয়; তারা মূলত ধর্মের নামে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদে বিশ্বাসী।


