:: নগর প্রতিদিন প্রতিবেদেন ::
দেশে ছোট বড় সব নদ-নদী এখন দখলদারদের কবলে ও ভয়ানক দূষণের শিকার। এ দখল-দূষণসহ বিভিন্ন কারণে নদ-নদী এখন মরতে বসেছে। এছাড়াও নদী থেকে বৈধ-অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনে অনেক নদী ক্ষতিগ্রস্ত। বে-সরকারী সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নোঙর বাংলাদেশ’র তথ্য অনুযায়ী নদী দখলের সঙ্গে প্রায় ৪৭ হাজার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত। যদিও বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। দখলবাজরা শুধু নদীর দুই পাড় দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা প্রবহমান নদীর পানিতে বাঁশ-কাঠের মাচা তুলে বানিয়েছে ঘরবাড়ি-দোকানপাট। পানি প্রবাহে বাধা দিয়ে করছে মাছ চাষ। এমন প্রেক্ষাপটে আজ দেশে ‘বিশ্ব নদী দিবস’ পালিত হচ্ছে। নদী রক্ষায় সচেতনতা বাড়তে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রোববার বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
নদী ও প্রাণ প্রকৃতি নিরাপত্তার সামাজিক সংগঠন নোঙর বাংলাদেশ-এর সভাপতি সুমন শামস বলেন, বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো প্রধানত পাঁচটি সংকটে পড়েছে। এগুলো হল-প্রবাহ স্বল্পতা, দখল, দূষণ, বালু-পাথর উত্তোলন ও ভাঙন। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর মূল উৎস ভারত-মিয়ানমারসহ উজান থেকে নেমে আসা পানি। উজানে অসংখ্য বাঁধ ও ড্যাম তৈরি করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সীমিত করা হয়েছে। পানির স্বল্প প্রবাহে নদী সংকুচিত হচ্ছে। সংকুচিত নদীর দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়ছে দখলবাজদের। দখলের সঙ্গে আছে দূষণের সম্পর্ক।
তিনি আরও বলেন, উপরের তিন সংকটের সঙ্গে আরও দুটি সংকট ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীতে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। এছাড়া উজান থেকে পানি নেমে যাওয়ার সময়ও নদী ভাঙন দেখা দেয়।
এক সময়ে বাংলাদেশে ছোট-বড় সাড়ে ১১শ’ নদী ছিল। বর্তমানে ৪০৫টি রয়েছে। নদী রক্ষায় সচেতনতা বাড়তে বিশ্বব্যাপী বছরের সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রোববার পালিত হয়ে আসছে ‘বিশ্ব নদী দিবস’। আজ সেই দিনটি বছর ঘুরে আবার এলো। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী ৬২ জেলায় নদী দখলবাজের সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার ব্যক্তি সম্পৃক্ত। দখলবাজদের তালিকা হলেও দখলবাজদের উচ্ছেদ-অভিযান খুব একটা হয় না। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে নদী-দখলবাজ উচ্ছেদে অভিযান নেই বললেই চলে। ঢাকায় মাঝে-মধ্যে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে অভিযান শুরুর পর অদৃশ্য কারণে তা স্থায়ী হয় না।
নদীর সংকটে পড়ার আরেকটি বড় কারণ দূষণ। ঢাকার চারপাশের চার নদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন নদ-নদীর দূষণ সীমাহীন। মাত্রাতিরিক্ত দূষণে সদরঘাটের বুড়িগঙ্গার পানি কুচকুচে কালো, হাজারীবাগের পানি রক্তের মতো লাল। তুরাগের পানি কোথাও কালো, কোথাও গাঢ় নীল। বালু নদের পানি ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। ওয়াসার পয়ঃবর্জ্য আর কলকারখানা থেকে ফেলা বিষাক্ত তরল বর্জ্যে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। নাগরিক জীবনে নেমে এসেছে নানা বিপর্যয়।
শুধু যে রাজধানীর আশপাশের জেলা নয়, সারা দেশে চলছে দখল-দূষণের আগ্রাসী প্রতিযোগিতা। নদীখেকোরা অনেকটাই অপ্রতিরোধ্য। মাঝে-মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও নানা ফাঁকফোকর আর সীমাবদ্ধতায় তা থমকে যায়। সরকারি উদ্যোগ আর আদালতের নির্দেশনাকে চ্যালেঞ্জ করে একের পর এক নদী গ্রাস করা হচ্ছে। নদ-নদীর দূষণ ও দখল রোধে উচ্চ আদালত দুই দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো প্রতিপালনের কোনো লক্ষণ নেই।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশের নদ-নদী দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এ তালিকা ধরে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। এ লক্ষ্যে এক বছর মেয়াদি ক্যাশ প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। ক্যাশ প্রোগ্রামের মধ্যে রয়েছে- নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নদীর সীমানা চিহ্নিত করা, মরা নদীর জমি চিহ্নিত করতে জরিপ করা ও জমি সংরক্ষণ করা, নদীর জমি লিজ দেয়া হলে এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে নদী রেকর্ড হয়ে থাকলে তা বাতিল করা।


