ঢাকাMonday , 24 April 2023
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আরও
  6. কর্পোরেট
  7. ক্রীড়াঙ্গন
  8. গণমাধ্যম
  9. জবস
  10. জাতীয়
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. ফিচার
  14. বাংলাদেশ
  15. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

রেকর্ড গড়ে রাজসিক আয়োজনে বঙ্গভবন ছাড়লেন আবদুল হামিদ

Link Copied!

অগ্রভাগে পতাকাবাহী অশ্বারোহী দল, তাদের পেছনে সশস্ত্র বাহিনীর ব্যান্ড দল বাদ্যযন্ত্রে তুলছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়’ গানের সুর। বঙ্গভবনের কর্মীরা দুই সারিতে লাল কাপড়ে মোড়ানো দড়ি ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলেন প্রধান ফটকের দিকে; সেই দড়ি বাঁধা ফুলে মোড়ানো এক খোলা জিপের সঙ্গে। জিপে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছিলেন আবদুল হামিদ ও তার স্ত্রী রাশিদা খানম। দুই পাশ থেকে তখন চলছে পুষ্পবৃষ্টি।

দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন ও আনুষ্ঠানিভাবে বিদায় নেয়ার রেকর্ড গড়ে এভাবেই বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. আবদুল হামিদ। টানা ১০ বছর ৪১ দিন দায়িত্ব পালন করা আবদুল হামিদকে সোমবার আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাল বঙ্গভবন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রপতিকে বিদায় জানানোয় অনন্য নজির দেখাল বঙ্গভবন।

সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল গ্রাউন্ডে গার্ড অব অনার দেয় প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট। ছবি: বঙ্গভবন প্রেস উইং

সোমবার বেলা ১১টার দিকে নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের শপথ গ্রহণের পর দুপুরে শুরু হয় আবদুল হামিদের বিদায় অনুষ্ঠান। বঙ্গভবন ছাড়ার পর আবদুল হামিদ রাজধানীর নিকুঞ্জে তার নিজ বাড়িতে ওঠেন।

বাংলাদেশে এর আগে ২০ জন রাষ্ট্রপতি বিদায় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউই এত দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় পাননি, যার রেকর্ড গড়লেন আবদুল হামিদ।

গত ১৭ এপ্রিল বঙ্গভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আবদুল হামিদের সম্মানে এক বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এর আগে গত মার্চে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে বিদায়ী মতবিনিময় করেছিলেন।

নতুন রাষ্ট্রপতির শপথের পর দুপুর দেড়টার দিকে আবদুল হামিদের বিদায় পর্ব শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) তাকে গার্ড অব অনার ও অভিবাদন জানায়। বঙ্গভবনের ক্রেডেনশিয়াল গ্রাউন্ডে এই গার্ড অব অনার দেয়া হয়। এরপর লাল গালিচায় হেঁটে গার্ড পরিদর্শন করেন আবদুল হামিদ।

গার্ড অব অনার পর্ব শেষে আবদুল হামিদ ও তার স্ত্রী রাশিদা খানম ওঠেন ফুলে সাজানো খোলা জিপে। বঙ্গভবনের ফোয়ারা থেকে প্রতীকী কায়দায় সেই প্যারেড কারকে দুটি দড়ি ধরে টেনে মূল ফটকে নিয়ে যান বঙ্গভবনের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরারা। এরপর প্রধান ফটক থেকে ভিভিআইপি প্রটোকলে বিদায়ী যাত্রা করেন আবদুল হামিদ। দীর্ঘ ১০ বছর পর বঙ্গভবন ছেড়ে নিকুঞ্জে তৈরি করা নিজের নতুন বাড়িতে যান।

বাড়িতে ঢোকার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, তার যেটুকু সাফল্য, সেজন্য তিনি দেশের মানুষের কাছে, এলাকার মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোটামুটি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন, সে জন্য তার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। আর কৃতজ্ঞ সাংবাদিকদের কাছে। কারণ তার বক্তব্য তারা ‘টুইস্ট না করে’ জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

আবদুল হামিদ বলেন, ‘এই যে রোদের মধ্যে আপনারা এসেছেন, আমার মত একজন সাধারণ মানুষের জন্য। যদিও আমি রাষ্ট্রপতি হয়েছিলাম, তবুও আমি সব সময় নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ মনে করি। আমার যে রাজনীতি, সেটা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। চেষ্টা করেছি দেশে সুষ্ঠু স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে, আগামীতেও চেষ্টা থাকবে। দেশের মানুষ সব দিক থেকে ভালো থাকুক, সুখী থাকুক সেটি চাই।’

প্রথম কোনো রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক বিদায়

বাংলাদেশে এর আগে ২০ জন রাষ্ট্রপতি বিদায় নিয়েছেন। তবে কেউই কার্যত আনুষ্ঠানিক বিদায় পাননি। আবদুল হামিদকে বঙ্গভবন আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাল। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক রাষ্ট্রপতিকে সামরিক কায়দায় গার্ড অব অনার ও প্রটোকল দিয়ে নিজের ঠিকানায় পৌঁছে দেন।

প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট সদস্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে গার্ড গার্ড অব অনার দেয়। পরে গার্ড পরিদর্শন করেন আবদুল হামিদ ছবি:বঙ্গভবন প্রেস উইং

বাংলাদেশের প্রথম ও ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর একদল বিপদগামী সদস্যের হামলায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আরেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হন।

মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তবে তার বঙ্গভবনে ওঠা হয়নি। তৃতীয় রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও চতুর্থ রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ মুহম্মদউল্লাহ তাদের মেয়াদ শেষ না করেই বিদায় নেন। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে আবারও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তনের ফলে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর নতুন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি হন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের একজন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তবে বিপ্লব-পাল্টা বিপ্লবে তিন মাসেরও কম সময় দায়িত্ব পালন করে তাকে বিদায় নিতে হয়।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েম, বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এবং আবুল ফজল মুহম্মদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে চাপের মুখে পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। সায়েমকে সরিয়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন এবং জিয়া হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হন। পরে আব্দুস সাত্তারকে সরিয়ে আবুল ফজল মুহম্মদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করেন তৎকালীন সিএমএলএ (প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। পরে তাকে সরিয়ে নিজেই দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গণআন্দোলনে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (১৪তম) হন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তিনি ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ থেকে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান।

পরবর্তী সময়ে আবদুর রহমান বিশ্বাস, সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রত্যেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাদের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করলেও তাদের বিদায়টা আনুষ্ঠানিক হয়নি। তারা তিনজনই অনেকটা নীরবে বঙ্গভবন ত্যাগ করেন। দেশের অষ্টাদশ রাষ্ট্রপতি একিউম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দেড় বছরের কিছু বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর অভিশংসন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছাড়েন। দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি ছিলেন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার (ভারপ্রাপ্ত)। দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান চার বছরের মতো দায়িত্ব পালন করে বার্ধক্যজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন।

জিল্লুর রহমান মৃত্যুর আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হন। পরে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল আবদুল হামিদ দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

আবদুল হামিদের বর্ণাঢ্য জীবন

১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কামালপুর গ্রামে জন্ম নেন আবদুল হামিদ। ১৯৫৯ সালে ছাত্রলীগে যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে সে সময়ের ময়মনসিংহ-১৮ (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ-৪) আসন থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশ স্বাধীন করতে।

মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে আবদুল হামিদকে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে সরকার। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচন, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচন, ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ এবং ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অষ্টম সংসদে ছিলেন বিরোধী দলীয় উপনেতার দায়িত্বে।

সপ্তম সংসদে ১৯৯৬ সালের ১৩ জুলাই থেকে ২০০১ এর ১০ জুলাই পর্যন্ত ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পালনের পর ২০০১ এর ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনা করেন আবদুল হামিদ। নবম সংসদে নির্বাচিত হওয়ার পর দ্বিতীয়বারের মতো স্পিকার হন।

দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের অসুস্থতার কারণে ২০১৩ সালের ১১মার্চ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান আবদুল হামিদ। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর হন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল শপথ নেন দেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে। এরপর ২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নেন।

বাংলাদেশে এত দীর্ঘসময় রাষ্ট্রপতি থাকার রেকর্ড আর কারও নেই। বাংলাদেশের আইনে দুই মেয়াদের বেশি কারও রাষ্ট্রপতি থাকার সুযোগও নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন