পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দায়ের একটি মামলায় রাজধানী ইসলামাবাদের হাইকোর্টে হাজিরা দিতে গেলে মঙ্গলবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইমরানের আইনজীবীর অভিযোগ, গ্রেপ্তারের সময় ইমরান খানের মাথায় আঘাত করা হয়েছে, তাকে লাথি মারা হয়েছে।
এদিকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ইমরান খানকে এভাবে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন পাকিস্তানের ইসলামাবাদ হাইকোর্ট। গ্রেপ্তারের ঘটনার পরপরই হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমির ফারুক ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলকে ১৫ মিনিটের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে ইমরান খানকে কোন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা জানাতে নির্দেশ দেন।
পাকিস্তানের সংবাদপত্র দ্য ডন জানিয়েছে, ইসলামাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আমির ফারুক বলেছেন, ‘আদালত যথেষ্ট সংযম প্রদর্শন করছে। আদালতে এসে বলে যান, ইমরানকে কেন এবং কোন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইসলামাবাদের পুলিশ প্রধান আদালতে হাজির না হলে আদালত প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে তলব করবে।’
পরে এক টুইটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার। সাবেক প্রধানমন্ত্রী (ইমরান খান), বর্তমানে যিনি দুর্নীতি মামলার আসামি, তিনি আইনি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার পায়তারা করছেন।’
টুইটে শাহবাজ শরিফ ইমরান খানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী নিয়ে মিথ্যাচার এবং গত নভেম্বরে ইমরানের ওপর হওয়া হামলার জন্য সেনাবাহিনীর ওপর দোষারোপ করার চেষ্টার অভিযোগ করেন।
গত নভেম্বরে ওই হামলায় ইমরান গুলিবিদ্ধ ও তার দলের একজন নিহত হন। আহত হন ১৩ জন। ইমরানের অভিযোগ, পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্রে তাকে হত্যা করতেই ওই হামলা চালানো হয়েছিল। সম্প্রতি ইমরান এ নিয়ে আবার অভিযোগ করলে গত সোমবার পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী তাকে সতর্ক করে।
এদিকে ইমরান খান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার দল পিটিআই নেতারা কর্মী-সমর্থকদের রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছে। তবে ইসলামাবাদের স্থানীয় প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে বলেছে, চারজনের বেশি মানুষ কোথাও জমায়েত হলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, সরকারের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও পিটিআইয়ের কর্মী-সমর্থকেরা ইসলামাবাদ, লাহোর ও পেশোয়ারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে।
ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পরপরই ইসলামাবাদ পুলিশের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সাবেক এই ক্রিকেটারকে কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
স্থানীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আধা সামরিক বাহিনী ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর সাজোয়া যানে তুলছে।
পিটিআইয়ের আইনজীবী আলি বুখারি বলেছেন, ‘আমরা হাজিরা দিতে আদালতের বায়োমেট্রিক কক্ষে ঢুকতেই আধা সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য আমাদের ওপর হামলে পড়ে। তারা তাকে (ইমরান খান) মারধর করেছে, টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে গেছে।’
ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের পর তাকে কোথায় নেয়া হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ইসলামাবাদের আদালতে হাজিরা দিতে লাহোর ত্যাগের আগে এক ভিডিও বার্তায় ইমরান বলেন, কর্তৃপক্ষ যদি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখাতে পারে, তাহলে তিনি জেলে যেতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমাকে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী, সেনাবাহিনী আনার কোনো দরকার নেই। যদি কারও কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকে, তাহলে তারা আমাকে ও আমার আইনজীবীদের দেখালে আমি নিজেই আত্মসমর্পণ করব।’
ইমরান খানকে গ্রেপ্তারের একদিন আগেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী তাকে ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ করার জন্য সতর্ক করেছে। তার আগে ইমরান আবারও অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনীর একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইমরান খানকে সেনাবাহিনীর ওই সতর্ক করার ঘটনায়ই বোঝা যায়, এই বাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন কতটা তলানিতে। অথচ ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই সেনাবাহিনীর সহযোগিতায়ই ইমরান ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে কথিত রয়েছে। তবে পরে সেই সম্পর্কে চির ধরে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় গত বছর পার্লামেন্টে ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট আনার আগ মুহূর্তে পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর আচরণে। সেই অনাস্থা ভোটেই ইমরানের সরকারের পতন ঘটে।


