:: কাজী পারভেজ ::
“যেই সরিষা দিয়ে ভূত তাড়াবো, সেই সরিষাতেই ভূতের বাস”, বহুকাল আগে থেকেই ভূত তাড়ানোর জন্য সরিষা পড়ার একটি প্রথা চলে আসছে। ভূত আদৌ আছে কি না, কিংবা সরিষার ভয়ে ভূত পালায় কি না, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। কিন্তু যদি ভূত তাড়ানোর সরিষার ভেতরেই গলদ বা ভেজাল থাকে, তবে ভূত পালানো তো দূরের কথা, আরও জাঁকিয়ে বসবে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষেত্রেও এই প্রবাদটি সাধারণ মানুষের কাছে চরম হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছিল। দুর্নীতি ও চরমপন্থী সংগঠনগুলোকে দমনের ব্যাপারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া আশ্বাসের বাণীগুলো মানুষ তখন এক ধরণের তামাশা হিসেবে দেখত। সরকারের বিগত বছরগুলোতে লাখ লাখ দলীয় নেতাকর্মী রাতারাতি ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে চরমপন্থীদের আত্মসমর্পণের যে নাটকগুলো সাজানো হতো, তা সচেতন জনগণের চোখ এড়াতে পারেনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের কথা মুখে বারবার বলা হলেও, দুর্নীতিবাজদের নিরাপদ আশ্রয় ছিল খোদ ক্ষমতার বগলের তলাতেই। রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতারা পর্দার আড়ালে চরমপন্থীদের লালন পালন করতেন, যা বাস্তবতায় রূপ নিয়েছিল।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে পুরোদমে অভিযান শুরু হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় র্যাব ও পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন চরমপন্থী দলের কয়েকশো সদস্য নিহত হয়, যাকে বাহিনীগুলো ‘ক্রসফায়ার’ বলে দাবি করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ২০০৫ সালে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মোফাখখার চৌধুরী, ২০০৮ সালে নিষিদ্ধ সংগঠন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এম এল জনযুদ্ধ) নেতা আব্দুর রশীদ মালিথা ওরফে দাদা তপন এবং একই বছরে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এম এল লাল পতাকা) নেতা ডা. মিজানুর রহমান টুটুলের ক্রসফায়ারের ঘটনা। শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর পর এসব চরমপন্থী সংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতা দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ একটানা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরেও কীভাবে নতুন করে এত চরমপন্থীর পুনরুত্থান ঘটল? এর অর্থ কি এক মুখে দুর্নীতি ও চরমপন্থা দমনের ফাঁকা আওয়াজ তোলা এবং রাতের অন্ধকারে তাদের সাথে আঁতাত করা?
যদিও শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রায়ই মাদক, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হতো। কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্প, হলমার্ক, ডেসটিনি, রেলওয়ের নিয়োগ জালিয়াতি ও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মতো উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির আগ্রাসী মিছিলে সরকার নিজেই বারবার বিব্রত হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা বাড়লেও এর বাস্তব প্রয়োগ ছিল হতাশাজনক।


