দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি এককভাবে ২০৯ আসনে জয়লাভ করেছে, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়েও অনেক বেশি।
এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে ২০০১ সালের পর আবারও সরকার গঠনের পথে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি নির্বাচনি জয় নয়; বরং দীর্ঘ আন্দোলন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক কৌশলের একটি বড় ফলাফল।
গুলশানে উচ্ছ্বাস, মাঠে উদযাপন
রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সারাদেশের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি অনেক নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বিজয়ী নেতাদের শুভেচ্ছা জানান।
কীভাবে এলো এই ফল?
বিভিন্ন জেলায় তৃণমূল পুনর্গঠন, প্রার্থী নির্বাচনে তুলনামূলক সতর্কতা, আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী- বিরোধী জনমত তৈরি ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার বলেন, বিএনপি একটি বিশাল সংগঠন, জনসমর্থন রয়েছে। আদর্শ নির্বাচন হলে অধিকাংশ সময়ই বিএনপি নির্বাচিত হয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, এই নিরঙ্কুশ বিজয় বিএনপির জন্য স্বাভাবিক। বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে যখন আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকে, তখন বিএনপিই সবচেয়ে বড় একক শক্তি হিসেবে দাঁড়ায়।
দুই-তৃতীয়াংশ আসন জয়ের কারণ
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিএনপির জয়ের পেছনে সাতটি কারণ উল্লেখ করেন
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল। তার মতে কারণগুলো হলো-
১. ৫০ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশব্যাপী শক্ত নেটওয়ার্ক।
২. দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার সময় নির্যাতনের শিকার হওয়ায় জনমনে সহানুভূতি।
৩. খালেদা জিয়ার হঠাৎ মৃত্যু ঘিরে সমর্থকদের আবেগ ও কৃতজ্ঞতাবোধ।
৪. ধর্মীয় রাজনীতির বিপরীতে মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক অবস্থান তুলে ধরা।
৫. তারেক রহমানের কর্মসূচিভিত্তিক ও তুলনামূলক সংযত প্রচারণা।
৬. প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর বক্তব্য ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে জনঅসন্তোষ।
৭. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা বড় দল আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি।
২০ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ওই মেয়াদে ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় বিরোধী রাজনীতিতে থাকা, মামলা-গ্রেফতার, আন্দোলন-সংগ্রাম সব মিলিয়ে দলটি এক কঠিন সময় পার করেছে। ২০৯ আসনের এই জয় সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ও নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মনে করছেন দলীয় নেতারা।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য রফিক সিকদার বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণ হবে। এরই মধ্যে তিনি বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিজয়ীদের কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকবে- সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
রাজনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন খান মোহন বলেন, বিএনপির নতুন সরকারের কাছে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি যে কারাগারে অপরাধী ছাড়া কোনো রাজনৈতিক বন্দি থাকবে না।


