বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বঙ্গভবনের দরবার হলে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী তাকে শপথ পাঠ করান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যসহ কয়েক শ বিশিষ্ট অতিথি এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, সংসদ সদস্য, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, রাজনৈতিক নেতা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনীতিক, সম্পাদকসহ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং পদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন নতুন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ড. রেবেকা সুলতানা ও ছেলে আরশাদ আদনান রনিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন। শপথ পড়ার পর নতুন রাষ্ট্রপতি ও বিদায়ী রাষ্ট্রপতি চেয়ার বদল করেন। এর আগে মো. সাহাবুদ্দিনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। চেয়ার বদলের পর মো. সাহাবুদ্দিন শপথ নথিতে স্বাক্ষর করেন। শপথের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন রাষ্ট্রপতিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এ সময় বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা উপস্থিত ছিলেন। পরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ৪১ দিনসহ টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১০ বছর ৪১ দিন অতিবাহিত করার পর অবসরে গেলেন।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন বীর মুত্তিযোদ্ধা মো. সাহাবুদ্দিন।
মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালে পাবনা শহরের জুবিলি ট্যাঙ্কপাড়ায় (শিবরামপুর) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা শরফুদ্দিন আনছারী ও মা খায়রুন্নেসা। তিনি পাবনা শহরের পূর্বতন গান্ধী বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে রাধানগর মজুমদার একাডেমিতে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন।
১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করার পর পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ১৯৬৮ সালে এইচএসসি ও ১৯৭১ সালে (১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত) বিএসসি পাস করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং পাবনা শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাহাবুদ্দিন মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
দেশ স্বাধীন হলে পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হিসেবে সাহাবুদ্দিন আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে মো. সাহাবুদ্দিনকে সামরিক আইনে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়। কারাভোগের পর মুক্ত হলে তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৮২ সালে বিসিএস (বিচার) ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন সাহাবুদ্দিন। তিনি ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে পরপর দুইবার বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়েরের পর এ মামলায় আইন মন্ত্রণালয় থেকে কো-অর্ডিনেটর হিসেবে নিয়োজিত থেকে দায়িত্ব পালন করেন সাহাবুদ্দিন।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পরপরই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা হয়। যাতে হত্যা, ধর্ষণ ও লুণ্ঠনের ঘটনা ঘটে। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে সেসব ঘটনার তদন্তে কমিশন গঠন করা হয়, যার প্রধান ছিলেন সাহাবুদ্দিন।
বিচারকের বিভিন্ন পদে চাকরি শেষে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর নেয়া সাহাবুদ্দিন ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে দায়িত্বে থাকাকালে বিশ্বব্যাংকের কথিত পদ্মা সেতু সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেন সাহাবুদ্দিন। তিনি অভিযোগটি মিথ্যা ও অন্তঃসারশূন্য প্রমাণে সমর্থ হন। তার পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদন কানাডার আদালতে সমর্থিত হয়।
সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের সর্বশেষ জাতীয় সম্মেলনের নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদেরও সদস্য তিনি।
আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের অন্যতম কাণ্ডারি হিসেবে পরিচিত সাহাবুদ্দিন পাবনা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতিও ছিলেন। পেশাগত জীবনের প্রথম দিকে সাংবাদিকতাও করেছেন। তিনি পাবনা প্রেস ক্লাব ও অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন-সদস্য।
১৯৭২ সালের ১৬ নভেম্বর পাবনা শহরের দিলালপুরের আলী আকতারের জ্যেষ্ঠ কন্যা ড. রেবেকা সুলতানার সঙ্গে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন সাহাবুদ্দিন। ড. রেবেকা সুলতানা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে ২০০৯ সালে অবসরে যান। তিনি বর্তমানে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্চ প্রোগ্রাম বিভাগের অধ্যাপক এবং ফ্রেন্ডস ফর চিলড্রেন অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
সাহাবুদ্দিন-রেবেকা দম্পতির একমাত্র সন্তান আরশাদ আদনান (রনি) দেশে ও বিদেশে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বর্তমানে একটি বেসরকারি ব্যাংকে উচ্চপদে কর্মরত।


