ঢাকাWednesday , 20 August 2025
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আরও
  6. কর্পোরেট
  7. ক্রীড়াঙ্গন
  8. গণমাধ্যম
  9. জবস
  10. জাতীয়
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. ফিচার
  14. বাংলাদেশ
  15. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ঘিলেফুল মিনিয়েচার: সুপ্রয়ার তুলি-ছোঁয়ায় পাহাড়ের আত্মকথা

Link Copied!

পাহাড় যেমন নিঃশব্দে কথা বলে, তেমনি তার অন্তর্গত গল্পও লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির বুকে। সেই লুকানো গল্পগুলো রঙ, রেখা আর ছোঁয়ার জাদুতে ফুটিয়ে তুলেছেন এক তরুণী শিল্পী—সুপ্রয়া চাকমা। তাঁর হাতে ‘ঘিলেফুল’ আজ আর শুধু লোককাহিনির রহস্য নয়, বরং হয়ে উঠেছে একটি নতুন শিল্পধারা—‘ঘিলেফুল মিনিয়েচার পেইন্টিং’, যা পাহাড়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতিফলন।

ঘিলেফুল: লোকবিশ্বাস থেকে শিল্পের ক্যানভাস:
‘ঘিলা’—পাহাড়ি অঞ্চলের গহীন অরণ্যে জন্ম নেওয়া এক রহস্যময় ফল। লোককথা বলে, যদি কারও চোখে ঘিলেফুল ফোটার দৃশ্য ধরা দেয়, তবে সে জন্মেছে রাজকপাল নিয়ে! এই বিশ্বাস থেকেই সুপ্রয়া চাকমা তৈরি করেছেন এক অনন্য শিল্পধারা। ক্ষুদ্র গোলাকার ফলটিকে তিনি রূপ দেন ক্যানভাসে, যেখানে আঁকা হয় পাহাড়ি উৎসব, প্রাচীন লোককাহিনি, প্রকৃতির দৃশ্য, নারী-পুরুষের মুখচ্ছবি কিংবা জাতিগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক ইতিহাস।

“আমি প্রকৃতিকে বিশ্বাস করি। ঘিলা আমার ক্যানভাস, আর আমি তার বুকে আঁকি পাহাড়ের গল্প”—বললেন সুপ্রয়া চাকমা।

শিল্পের পথচলা ও সংগ্রাম:
খাগড়াছড়ির মেয়ে সুপ্রয়া চাকমা মানিকছড়ির রানী নিহার দেবী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। প্রতিভা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একাধিকবার সরকারি চাকরির ভাইভা বোর্ডে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তিনি। তবে হতাশ না হয়ে বেছে নেন নিজের সৃজনশীল পথ। বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ি পুলিশ লাইন্স হাই স্কুলে চারুকলার সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রথম প্রদর্শনীতে আলোড়ন:
২০২৩ সালে খাগড়াছড়িতে আয়োজিত “রঙ তুলিতে পাহাড় ও শিল্পভাবনা” প্রদর্শনীতে প্রথমবার জনসম্মুখে আসে তাঁর “ঘিলেফুল মিনিয়েচার”। ১১ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ প্রদর্শনীতে সুপ্রয়ার কাজ সকলের নজর কেড়ে নেয়। এখন পর্যন্ত তিনি তৈরি করেছেন ৩০৪টি ঘিলেফুল চিত্রকর্ম—প্রতিটি একটি গল্প, একটি সময় ও একটি অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।

জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বপ্ন:
আজ তাঁর আঁকা ঘিলেফুল চিত্র স্থান করে নিয়েছে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অফিস এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। বিদেশি শিল্পসংগ্রাহকরাও এই অনন্য শিল্পকে নিচ্ছেন সম্মান ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে। তিনি ইতোমধ্যে এই শিল্পধারাটিকে কপিরাইট আইনে নিবন্ধিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।

পাহাড়ের সন্তান, পাহাড়ের অহংকার:
খাগড়াছড়ি সদরের দক্ষিণ খবং পড়িয়ার মিন্টু বিকাশ চাকমা ও গীতা চাকমা দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান সুপ্রয়া দৃঢ়ভাবে বলেন—
“এই ভূমি, এই পাহাড় আমাকে শিখিয়েছে রঙের ভাষা। আমি চিরকাল নিজেকে পাহাড়ের সন্তান হিসেবেই দেখব।”

তাঁর ভাষায়—শিল্প কেবল চিত্র নয়, এটি চেতনার বহিঃপ্রকাশ। তাই তিনি চান, তাঁর এই শিল্পধারা নতুন প্রজন্মের জন্য হয়ে উঠুক অনুপ্রেরণার উৎস।

শিল্পের নতুন দিগন্ত:
“ঘিলেফুল মিনিয়েচার” কেবল একটি শিল্পধারা নয়, এটি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ। সুপ্রয়া চাকমা দেখিয়ে দিয়েছেন—যে শিল্প হৃদয় থেকে জন্মায়, সেই শিল্প বিশ্ব জয় করতে বাধ্য।

তাঁর অন্যান্য চিত্রকর্মেও উঠে আসে—নারীত্বের কোমলতা, মা ও সন্তানের অদৃশ্য বন্ধন, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক এবং পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র।

আহ্বান নতুন প্রজন্মের প্রতি:
বাংলাদেশে এই প্রথম “ঘিলেফুল মিনিয়েচার পেইন্টিং”-এর উদ্ভাবক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন সুপ্রয়া চাকমা। তিনি সরকারিভাবে এই শিল্পকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা পান। একইসঙ্গে তরুণ শিল্পীদেরও আহ্বান জানিয়েছেন নিজেদের সংস্কৃতি ও শেকড়কে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়ার জন্য।

“ঘিলেফুল মিনিয়েচার” শুধু এক শিল্পধারা নয়—এটি এক পাহাড়িদের আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ, সংস্কৃতির গর্ব আর সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি।
সুপ্রয়া চাকমা প্রমাণ করেছেন—যে শিল্প প্রকৃতি ও হৃদয়ের গভীরতা থেকে জন্ম নেয়, সে শিল্প সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজয় করবেই।

নিউজটি শেয়ার করুন