দেশের বস্ত্র ও পাট খাতের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো এলাকায় হবে এ জাদুঘর। জামদানির বাজারজাত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তাঁতশিল্পীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিশ্চিতে সেখানে প্রদর্শনী, বিক্রয় ও বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রও করা হবে। এ ছাড়া তাঁতিদের দক্ষতা বাড়াতে এবং নতুন নতুন ডিজাইন উদ্ভাবন করতে করা হবে একটি ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট।
এ জন্য ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর, জামদানি শিল্পের উন্নয়নে প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র, বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং একটি ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পুরোটাই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে আসবে। অনুমোদন মিললে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
প্রস্তাবিত ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর’ মুজিববর্ষে বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে অনুযায়ী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি তারাবোতে স্থান নির্ধারণ করে।
তাঁত বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ ২০১৮ সালের তাঁতশুমারি অনুযায়ী আড়াইহাজারে ২০০টি, সোনারগাঁওয়ে ২ হাজার ৭৯৯টি, রূপগঞ্জে ৩ হাজার ১৮৫টিসহ সারাদেশে ১০ হাজার ৫৩টি জামদানি তাঁত রয়েছে। সেই হিসাবে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িত।
তাঁত বোর্ড থেকে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় বরাবর সোনারগাঁও-রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার অঞ্চলটি ছিল এ কাপড় তৈরির প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া, রূপসী, সøুইসগেট, গঙ্গানগর, বরাবো, পবনকুল, মৈকুলী, খাদুন ও পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁও এবং সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় এই শিল্প বিদ্যমান। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও জামদানি তাঁতশিল্প রয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওকে ‘ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি’র মর্যাদালাভের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। জামদানি ঘিরে উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে সোনারগাঁওকে ওয়ার্ল্ড ক্রাফট কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে প্রথম বাংলাদেশের কোনো স্থান ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটির মর্যাদা লাভ করে।
২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক সামগ্রী হিসেবে স্বীকৃতি পায় জামদানি। এর আগে ২০১৩ সালে ইউনেসকো জামদানি শিল্পকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের’ মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়।
জামদানি তাঁতিদের কাছ থেকে জানা যায়, তারা বিসিকের কাছ থেকে প্লট ছাড়া কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। বিসিক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকল্প ও নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তারা জামদানি পল্লী নিয়ে চিন্তা করার সময় পান না। পানির লাইন, গ্যাস-বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সমস্যার সমাধান তাঁতিদেরই করতে হয়।
বিসিক, নোয়াপাড়া জামদানি পল্লীর হাটে বৃষ্টির সময় পানি পড়ে, বাতাস ও বৃষ্টি হলে দোকান গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। হাটে কোনো শৌচাগার, বিশ্রামাগার, ক্যান্টিন নেই।
জামদানি কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত এক ধরনের সূক্ষ্ম বস্ত্র। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি বেশ জনপ্রিয়। কাপড়ের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। আবার সুতি সুতার সঙ্গে সিল্ক সুতার সমন্বয়েও তৈরি করা হয় জামদানি কাপড়। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়িকেই বোঝানো হয়। তবে জামদানি দিয়ে নকশি ওড়না, সালোয়ার, কামিজ, ফতুয়া, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা প্রভৃতি তৈরি করা হয় বলে জানান তাঁতিরা।


