:: মোহাম্মদ শফিক কক্সবাজার ও মো. জয়নাল আবেদীন টুক্কু নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে ::
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের বিপরীতে সারা দিন ভারী গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেরেছেন সীমান্তের বাসিন্দারা; এতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। মিয়ানমার থেকে আসা গোলার বিস্ফোরণে রোহিঙ্গাদের হতাহতের ঘটনার পর শনিবার সকালে সীমান্ত এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
তবে শনিবার কোনো গোলা বাংলাদেশের সীমানায় এসে পড়েনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
এদিকে, বাংলাদেশ সীমান্তে গুলাগুলি ও উত্তেজনার কারনে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ের এসসসি পরীক্ষা কেন্দ্র স্থানান্তর করে উখিয়ার কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সকাল ৯টার দিকে উখিয়া উপজেলা প্রশাসন, কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ ও উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা শেখ মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে কয়েকটি বাসে করে পরীক্ষার্থীদের কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। এর পর তারা বাংলা ২য় পত্রের পরীক্ষায় অংশ নেয়। ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৪১৯ জন। তবে শুরু থেকে ৩ জন অনুপস্থিত ছিল বলে স্কুল সূত্রে জানা গেছে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা শেখ মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সীমান্তে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কুতুপালং উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। যতদিন দরকার এ সুবিধা প্রদান অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।’
শনিবার বেলা ১১টায় শুরু হয়ে এসএসসি বাংলা ২য় পত্রের পরীক্ষা চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম জানান, যতদিন সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হবে, ততদিন এ বাস সেবা অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী ও সম্পাদক নুরুল হুদা তার পাশে থেকে সহযোগীতা করে যাচ্ছেন।
্আমাদের নাইক্ষ্যংছড়ি সংবাদদাতা জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে শনিবার সকালে হেলিকপ্টার থেকে ব্যাপক গুলাগুলি চলে। বিকালে কিছুক্ষণ বন্ধ থাকেও সন্ধ্যা ৬টায় আবারও গুলি ছোড়া হয়। সে দেশের ফাইটার হেলিকপ্টার ৩৪-৩৫নং সীমানা পিলারের ওপর দিয়ে চক্কর দেয়। ঘুমধুম ইউনিয়নের মো. সরওয়ারসহ অনকে জানান, ওপার থেকে যুদ্ধ বিমান থেকে ছোড়া মর্টার শেল ও গুলির খোসা এসে পড়েছে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রুং সীমান্তে। এ ঘটনায় সীমান্ত জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সীমান্তের আরো কঠোরভাবে নিরাপত্তা জোরদার করেছেন বিজিবি।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, শনিবার সকাল থেকেই সীমান্তের ওপারে থেমে থেমে গোলাগুলি হয়। সকাল ১০টা পর থেকে গোলাগুলি আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখনো সাংবাদিকদের তুমব্রু সীমান্তে ঢুকতে দিচ্ছে না বিজিবি।
দেশটির বেদ্রোহী গ্রুপ আরকান আর্মি (এএ) ও সেনাবাহীনীর সঙ্গে মাসাধিকাল ধরে চলা এ উত্তেজনা মাঝে একটু ঠাণ্ডা হলেও গত শুক্রবার রাত ৮টার দিকে বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্তের ৩৪ নম্বর পিলারের জিরো লাইনে রোহিঙ্গা শিবিরে চারটি মর্টার শেল এসে পড়ে। এগুলোর মধ্যে একটি বিস্ফোরিত হয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১৭ বছরের কিশোর মোহাম্মদ ইকবাল নিহত হয় এবং স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক কিশোরের পা উড়ে গেছে। এছাড়া গোলার আঘাতে আহত হন পাঁচজন।
এদিকে মাসাধিকাল ধরে চলা এ ঘটনার দিন দিন আতঙ্ক ভর করছ সীমান্তরত বসবাসরতদরে মধ্যে। আতঙ্কে বন্ধ করা দেওয়া হয় তুমব্রুসহ আশপাশের বাজারের দোকানপাট। এছাড়া বিজিবি সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করেছে। তাঁরা সীমান্তে কাউকে যেতে দিচ্ছে না। আর গভীর রাতেও সীমান্তে গোলাগুলি শব্দে আতংকে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয়রা। কুটনৈতিক পর্যায়ে বসে এটির দ্রুত সমাধান চায় তাঁরা।
তিনি আরো জানান, শুক্রবার নো ম্যান্স ল্যান্ডে মর্টার শেলে ইকবাল নামের এক রোহিঙ্গা মৃত্যু হয়। তার পোস্টমর্টেম ও দাফন হয়নি। আর শিশুসহ আহত ৬ জনের মধ্যে ২ জন কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে, ৩ জন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও অপর ১ জন চট্টগ্রাম এমএস এফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্ত ঘেষা নো ম্যান্স ল্যান্ডে রোহিঙ্গা শরনার্থী বসবাস করছে ৪ হাজার ৬৬৩ জন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে শূন্যরেখায় বসবাসকারি রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, শুক্রবার রাতে সাড়ে ৮টার দিকে শূন্য রেখায় বসবাসকারি রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে এসে পড়ে ৩টি মর্টার শেল। ক্যাম্পের নিটকর্বতী এলাকায় এসে পড়ে আরো ২টি। ৫টি মর্টার শেল পরপর বিস্ফোরণ হয়েছে। এ ঘটনার পর থেকে সীমান্তে থাকা বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরনার্থীরা ওই এলাকা ছেড়ে অনেকে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।
বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফয়জুর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এখনো ২টি মর্টার শেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় আছে। সেগুলো ঘিরে রাখা হয়েছে। ওই এলাকায় চলাচলে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি বলেছিলেন, মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। আমরা শুরু থেকেই সতর্ক আছি। মিয়ানমারের কোনো নাগরিক যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারেন, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। তাদের গোলা যেন আমাদের দেশে না আসে সে বিষয়ে তাদের আগেও জানানো হয়েছে। নতুন করে আবারো জানানো হবে এবং কূটনৈতিকভাবেই এটি বন্ধ করার জন্য আলোচনা হচ্ছে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরিজী বলেন, প্রশাসন পক্ষ থেকে ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে জনগন নিরাপদে থাকার জন্য নির্দেশনা দেয়। আর শনিবার আমরা জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিভাবে সেখানকার বসবাসকারীদের নিরাপদ রাখা যায় সেই বিষয়ে।


