দেড় বছর আগে নির্মাণ কাজ শেষ করে হস্তান্তর করা হয়েছে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারটি। কিন্তু আদৌ এই গন্থাগারের কার্যক্রম শুরু হয়নি। যদিও অর্থ সংকটের কারণে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম সাধারণ গ্রন্থাগারটি আংশিক নির্মাণ করা হয়েছে।
ইন্ডিয়ার অর্থায়নে ও রাজশাহী সিটি কপোরেশনের অধিনে নির্মাণ কাজ শেষ করে জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। টানা দেড় বছর চলে গেলেও এর কার্যক্রম চালুর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
আর কবে নাগাত এর কার্যক্রম চালু হবে সেটিও স্পষ্ট নয়। তবে রাজশাহীর সচেতন মহল বলছেন, ঐতিহ্য রক্ষায় যত দ্রুত সাধারণ গন্থাগারের কার্যক্রম শুরু করা দরকার। আর জেলা প্রশাসক বলছেন, যতই সংকট থাক, বিষয়টি আমরা দ্রুততার সাথে দেখছি।
জানা গেছে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ৩ কোটি ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সাধারণ গ্রন্থাগারটি নির্মাণ করেছে। সাধারণ গ্রন্থাগার নির্মাণে অর্থায়ন ছিল ইন্ডিয়ার একটি প্রকল্প।
রাজশাহী মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধিনে সাধারণ গ্রন্থাগারটি নির্মাণ করা হয়। রাজশাহী নগরীর মিয়াপাড়ার সাধারণ গ্রন্থাগার নির্মাণ নিয়ে বেশ কয়েকবার জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকবার হয়েছে নকশা বদল। কারণ এই প্রাচীনতম ভবন না ভাঙ্গার জন্য একটি পক্ষ রাস্তায় দাঁড়ায়।
আবার এটি ভেঙ্গে সংস্কার করার দাবি একটি পক্ষ জানায়। ২০১৬ সাল থেকে সাধারণ গ্রন্থাগারটির নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া। এরপর ২০১৮ সালে পুরোনো ভনটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। আর কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধিনে সাধারণ গ্রন্থাগারটি নির্মাণ করা হলেও আংশিক করা হয়েছে।
নকশায় এখানে যা যা করার কথা ছিল তা করা হয়নি। শুধু মাত্র লাইব্রেরীটুকু নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছে।
রাসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এ সাধারণ গন্থাগারের কাজ শুরু করা হয়। এখানে আধুনিক মানের লাইব্রেরির সাথে একটি অডিটরিয়াম নির্মাণ করার কথা ছিল। কিন্তু টাকার অভাবে তা করা হয়নি।
প্রায় ৩০০আসনের একটি আধুনিক মানের অডিটোরিয়াম নির্মাণ হলে এখানে বাড়তি আয়ের উৎস তৈরি হতো। যা এখন আর হবে না। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে বিসমিল্লাহ বর্ষণ এন্ড কোং নামে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এ নির্মাণ কাজ শুরু করে। কাজ শেষ করে রাসিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর রাসিক গত ২৩ সালের ডিসেম্বররে এটি জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে। জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা প্রায় দেড় বছর হতে চললো। তারপরও এর কার্যক্রম শুরুর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
জানা গেছে, সাধারণ গ্রন্থাগারটি পুনঃনির্মাণের জন্য ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ভবনটি ভেঙ্গে ফেলে সিটি কর্পোরেশন। আর এখানকার বইগুলো রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়।
বইগুলো এখনো সেখানেই রয়েছে। প্রথম দফায় গ্রন্থাগারটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয় রাসিক। সেখানে ‘সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ, প্রত্নতত্ত্ব অবকাঠামো উন্নয়নসাধন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে সেখানে অডিটরিয়াম নির্মাণ করার কথা ছিল। যা হয়নি। এছাড়াও ছোটখাটো অনেক কিছু আছে যেগুলো অর্থ সংকটের কারণে নির্মাণ করা হয়নি।
তবে অনেকেই বলছেন এই গন্থাগারের কমিটির লোকজনের উদাসিনতা, অবহেলা, আর যে টাকা ব্যবহার করা হয়েছে সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার না হওয়ার কারণে সাধারণ গন্থাগারের আজ এই দুরাবস্থা।
রাসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) সুব্রত কুমার সরকার জানান, সমন্বিত নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অধিনে মূলত কয়েকটি কাজ ছিল। এই প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ছিল ২২ কোটি টাকা। অন্যান্য উন্নয়ন কাজের মধ্যে একটি রাজশাহী নগরীর মিয়াপাড়া সাধারণ গন্থাগার নির্মাণ। অর্থ সংকট থাকায় নকশায় যা ছিল তার মধ্যে শুধু লাইব্রেরী স্থাপন করেই নির্মাণ শেষ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এখানে একটি আধুনিক মানের অডিটরিয়াম নির্মাণ করার কথা ছিল যা হয়নি। এটি নির্মাণ হলে গন্থাগারের একটা আয়ের উৎস তৈরি হতো। তিনি আরো বলেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আমরা গন্থাগারটি নির্মাণ শেষ করে জেলা প্রশাসককে হস্তান্তর করেছি।
বিষয়টি নিয়ে গন্থাগারের সভাপতি গোলাম মাওলার সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। সূত্র মতে, গোলাম মাওলা রাজশাহী পুলিশ লাইন্স স্কুল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। গত ৫ আগস্টের পর তোপের মুখে তিনি ওই কলেজ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর আর তাকে প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না। এমন কি সাধারণ গন্থাগারের সভাপতি হওয়ার পর তিনি কোনো খোঁজ খবর রাখেন না।
বিষয়টি নিয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার জানান, যত দ্রুত সম্ভব সাধারণ গন্থাগারের কার্যক্রম শুরু করা হবে। কারণ এই গন্থগার এ অঞ্চলের একটি প্রাচীনতম গন্থাগার। এটিকে নিয়ে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
ইতিহাস থেকে জানা গেছে, রাজা আনন্দনাথ প্রথম ১৮৬৬ সালে পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের কাশিমপুর হাউসে এ গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৮৮৪ সালে রাজা দীঘাপতি রাজা প্রমথনাথ গ্রন্থাগারটির ভবন নির্মাণের জন্য নগরীর মিয়াপাড়ায় ৪৪শতক জমি দান করেন। এখানেই তৈরি হয়েছিল গন্থাগারের দ্বিতল ভবন।
এর খরচ বহন করতেন কাসিমপুরের জমিদার কেদার প্রসন্ন লাহিড়ী। তাঁর বাবার নামে ভবনের মিলনায়তনের নাম রাখা হয়েছিল ‘গিরিশ চন্দ্র হল’। ১৮৮৪ সালের ৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। এই গ্রন্থাগারে ১০টি কক্ষ ছিল এবং সেই সময় লাইব্রেরীতে ১৮৭১-৭২ সালে ৩২৪৭ টি বই সংরক্ষণ ছিলো। বর্তমানে বই রয়েছে ৩৬ হাজার। এর মধ্যে ২৯টি বইয়ে স্বহস্তে স্বাক্ষর করে পাঠিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
ঐতিহ্যাবাহী এ গ্রন্থাগার দেখে অভিভূত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী, সরোজিনী নাইডু, মোহিতলাল মজুমদার, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জলধর সেন, স্যার আজিজুল হক, সজনী কান্ত দাস, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, শরৎচন্দ্র বোসসহ আরও অনেকে। এ গ্রন্থাগারের ভূয়সী প্রশংসা গ্রন্থাগারটির মন্তব্য খাতায় এখনো উজ্জল হয়ে আছে।
রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে যাতায়াত ছিল এমন বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৯২৯), জে জি ড্রমান্ড, রজনীকান্ত দাস, প্রফুল্ল কুমার সরকার, গডফ্রেজ যখমন, শিশির ভাদুড়ী প্রমুখ। মূলত স্থাপনাটি কেবল গ্রন্থাগারই ছিল না, এ ভবনটি ছিল উত্তারাঞ্চেলের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার।


