সুন্দরবনে দেশ-বিদেশী পর্যটকদের সংস্পর্শে আসা বন্যপ্রাণীর শরীরে বহন করা বিভিন্ন ভাইরাস ও রোগ জীবানু নির্ণয়ের জন্য নমুনা সংগ্রহ শুরু করছে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ একটি মেডিকেল টিম।
বন্যপ্রাণীর শরীর থেকে বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরার কারণেই এমন উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। সুন্দরবনে প্রজনন কেন্দ্রটি সৃষ্টির ২০ বছর পর এই প্রথম বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ও পর্যটক স্পটগুলোতে খাচায় সংরক্ষিত এবং উন্মুক্ত ভাবে চলাচল করা বন্যপ্রাণীদের রক্তের নমুনা নিয়েছে তারা।
বন বিভাগ বলছে, বন্যপ্রাণীর শরীরে বহন করা বিভিন্ন মারণ ঘাতক ভাইরাস বনের সৌন্দর্য দেখতে আসা পর্যটকদের দেহে ছড়িয়ে পরতে পারে, এমন সন্দেহে বন্যপ্রাণীদের পরীক্ষা-নিরিক্ষার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের সন্দেহ সঠিক হলে প্রয়োজনে সুন্দরবনের সব প্রাণীকে পরীক্ষা ও চিকিৎসার আওতায় আনা হবে।
বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়, সুন্দরবনের মনোরম পরিবেশের সৌন্দার্য উপভোগ করার জন্য দেশ-বিদেশী পর্যটকরা ভ্রমণে এসে বনের সুন্দরী বন্যপ্রাণীদের দেখলেই একটু ছুয়ে দেখতে মনে চায় অনেকেরই। কেউ বন্যপ্রাণীর কাছে গিয়ে ছবি তুলে আবার কেউ ছোট ছোট শিশু-কিশোরদের নিয়ে নিজ হাতে খাবার খাওয়াতে পছন্দ করেন। তবে অনেকেই জানে না এ বন্যপ্রাণীদের শরীরে বহন করতে পারে মরণ ঘাতক বিভিন্ন রোগের ভাইরাস ও জিবানু। তাই বন বিভাগের গ্রহণ করা ‘সুফল নামের প্রকল্পের’ মাধ্যমে দেশে যতগুলো বন্যপ্রাণীর অভায়রণ্য, প্রজনন কেন্দ্র বা বিভিন্ন জায়গা থেকে সংরক্ষণকরা বন্যপ্রাণী রয়েছে, সেসব প্রাণীর শরীর থেকে রোগ বা রোগের ভাইরাস নির্নয় করার জন্য রক্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। অন্যান্য জায়গার ন্যায় গেল সপ্তাহে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র থেকে এই প্রথম সরাসরি মানুষের সংস্পর্শে আসা ১০টি হরিণ ও ১০টি বানরের রক্তের নমুনা নেয় ৫ সদস্যের বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ চলবে আগামী ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। আর পর্যাক্রমে নেওয়া হবে সব প্রাণীর রক্তের নমুনা।
তারা বলছেন, দেশের বেশ কয়েকটি বন্যপ্রাণী অভায়রণ্য রয়েছে, যেমন কেশপপুরে হনুমানের অভায়রণ্য, মৌলভী বাজারে শিম্পাঞ্জি ও উল্লুকের অভায়রণ্য, মাদারীপুর বানর ও গাজীপুর সাফারী পার্কসহ যেসব জায়গায় বন্যপ্রাণী বসবাস করছে, সেখান থেকে ওই সব প্রাণীর শরীর থেকে রক্তের নমুনা নেওয়া হবে। তবে সুন্দরবনে সরকারি প্রজনন কেন্দ্রটি স্থাপিত হওয়ার পর এই প্রথম বন্যপ্রাণীদের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আর যেসব প্রাণীর নমুনা নেওয়া হয়েছে তার প্রতিবেদন আগামী নভেম্বর শেষের দিকে প্রকাশ হবে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরার কারণে এবং এখানে প্রতিদিন শত শত দেশ-বিদেশী মানুষ সুন্দরবনে ভ্রমণে আসেন এবং বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে আসে তাই এমন উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
বন বিভাগের ভেটারীনারী সার্জন ও বন্যপ্রাণী রোগ নির্ণয় গবেষক ডা. নিজাম উদ্দিন চৌধুরী ও বন বিভাগের সুফল প্রকল্পের সরকারী গবেষণা কর্মকর্তা ডা. রবিউল হাসান বলেন, করোনা ভাইরাস, বার্ডফ্লু, নিপা ভাইরাস ও টিবিসহ বেশ কিছু বড় বড় রোগের ভাইরাস বা জিবানু বহন করতে পারে বন্যপ্রাণী, আর এ ধরনের বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে আসলে মানবদেহে প্রবেশ করে বড় ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরেস্টার হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, ২০০২ সালে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রেটি সরকারি ভাবে চালু করা হয়েছে। সে সময় থেকে অদ্যবদি অনেক পর্যটক কুমির ও বানরের কামরে আহতও হয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কারও কোন ক্ষতি হয়নি। আমাদের বন বিভাগের পক্ষ থেকে আহত ব্যক্তিদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে, যাতে পরবর্তীতে কোন ব্যাধিতে আক্রান্ত না হন। এছাড়া সংরক্ষন করা বা উন্মুক্ত অবস্থায় রাখা বন্যপ্রাণীদের শরীরে এখন পর্যন্ত কোন রোগ বা ভাইরাসের সন্ধানও পাওয়া যায়নি। আর বন্যপ্রাণীদের সংস্পর্শে কোন পর্যটকদেরও কোন রোগ বা ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যায়নি। তার পরেও সন্দেহ থাকায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
বিলুপ্ত প্রজাতির বন্যপ্রাণী প্রজনন ও বংশ বৃদ্ধি জন্য ২০০২ সালে সরকারি ভাবে পূর্ব সুন্দরবনের করমজলে দেশের একমাত্র বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রটি স্থাপিত হয়। যেখানে ১৯৫টি কুমির, ৯৬টি হরিণ ছাড়াও উন্মুক্ত ভাবে সহাস্রাধিক বানরসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী রয়েছে।


