:: জাওহার ইকবাল খান ::
সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও কল্যাণকামী মনোভাব থাকা জরুরি। ক্ষতি করার প্রবৃত্তি সমাজে অশান্তির আগুন জালিয়ে দেয় এজন্য ইসলাম কারও ক্ষতি করার অনুমোদন দেয়না।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্যও করা যাবে না। যে অন্যের ক্ষতি করল আল্লাহ তার ক্ষতি করবেন এবং যে তার সঙ্গে শত্রুতা করবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন।’ -সুনানে দারাকুতনি:৩০৭৯
আলোচ্য হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) মুমিনদের সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এর দ্বারা বুঝা যায়, ‘ক্ষতি’ প্রতিহত করা ইসলামের মূলনীতি। সে নিজেকে যেমন ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, তেমনি অন্য ক্ষতিগ্রস্থ হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে। হাদিসের ব্যাখ্যাকার মোল্লা আলী কারি (রহ.) বলেন, ‘এই কথা স্পষ্ট যে, শারীরিক, আর্থিক, পার্থিব ও পরকালীন সব ধরনের ক্ষতি এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত। -মিরকাতুল মাফাতিহ: ৮/৩১৫৬
এই হাদিসকে মূলনীতি ধরে ইসলামি স্কলাররা বলেছেন, ক্ষতিকর ও হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে নিজেকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেওয়া হারাম। অন্যের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। জীবন, সম্পদ, পরিবার ও সম্ভ্রমসহ সব ধরনের ক্ষতিকর বিষয় পরিহারযোগ্য।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিন-মুসলমানদের সর্বপ্রকার ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। এর দ্বারা বোঝা যায়, ‘ক্ষতি’ প্রতিহত করা ইসলামের মূলনীতি। মানুষ যেমন নিজেকে ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে, তেমনি অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে। ইসলামি শরিয়তের সাধারণ বিধানে ক্ষতিকর বিষয়াদি নিষিদ্ধ। ক্ষতি হওয়ার আগে প্রতিহত করা এবং ক্ষতি হয়ে গেলে তা দূর করা ইসলামের নির্দেশ। ইসলাম স্পষ্টভাবে নিজের ও অন্যের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছে। যারা অন্যকে ক্ষতির মধ্যে ফেলে দেয়, হাদিসে তাদের অভিশপ্ত বলা হয়েছে। হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের ক্ষতিসাধন করে বা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সে অভিশপ্ত।’ -সুনানে তিরমিজি: ১৯৪১
অন্য হাদিসে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে অন্যের ক্ষতি করে আল্লাহ তার ক্ষতি করেন এবং যে অন্যের শত্রুতা করে আল্লাহ তাকে শাস্তি দেন।’ -সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৩৫
ক্ষতি ইসলামে নিষিদ্ধ হলেও আমাদের সমাজের অনেকেই অবলীলায় জেনে-বুঝে অন্যের ক্ষতি করে চলছে। কিছু মানুষের এমন অন্যায্য ও অনৈতিক ব্যবহারে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে অন্য মানুষ। ফলে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয়। মূলত মানুষের মানসিক বিকৃতি, হিংসা, উচ্চাশা, হতাশা কিংবা অস্থিরতা থেকে একে অন্যের ক্ষতিতে লিপ্ত হয়। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজজীবনে এমন হাজারো ঘটনা ঘটছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, কোনো কারণ ছাড়া কিংবা সামান্য স্বার্থের কারণে, ক্ষেত্রবিশেষ হাসি-ঠাট্টা করে অন্যের ক্ষতি করছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মায়া-মমতা ও স্নেহ-ভালোবাসাকে বিসর্জন মানুষের এমন অবশ্যই নিন্দনীয় ও বর্জনীয়। অফিস, পরিবার, সমাজ ও রাজনীতি থেকে শুরু করে সভা-সমিতিসহ নানা কাজে নিজেকে জাহির করা, নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, কিছু বাড়তি সুবিধা নেওয়ার জন্য মানুষ মিথ্যাচার, অপবাদ, নিন্দা, ষড়যন্ত্র ও চাকুরিচ্যুতি থেকে শুরু করে হত্যার মতো জঘন্য কাজ করছে। নিজের জিদের লাগাম টানতে পারছে না মানুষ। এভাবে একে অপরের ক্ষতিসাধন করা একেবারে মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) অপরের অনিষ্ট তথা ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকাকে সদকা বা সাধারণ দান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সাহাবি হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলমানের দান-খয়রাত করা ওয়াজিব। সাহাবিরা বলেন, সে যদি তা করতে সক্ষম না হয় বা তা করতে না পারে? তিনি (নবী করিম সা.) বলেন, তাহলে সে স্বহস্তে কাজ করে নিজেকে লাভবান করবে এবং দান-খয়রাত করবে। সাহাবিরা বলেন, যদি তার সে সামর্থ্য না থাকে বা সে তা না করতে পারে? তিনি বলেন, তাহলে সে দুস্থ-বিপদগ্রস্থকে সাহায্য করবে। সাহাবিরা বলেন, সে যদি তাও না করতে পারে? তিনি বলেন, তাহলে সে সৎ কাজের আদেশ দেবে। তারা বলেন, যদি সে তাও না করতে পারে? তিনি বলেন, তাহলে সে অপরের ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকবে। এটাই তার জন্য দানস্বরূপ। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
অন্য আরেক হাদিসে এসেছে, সাহাবি হজরত আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) কে বলা হলো, সর্বোত্তম আমল কী? তিনি বলেন, আল্লাহতায়ালার প্রতি ইমান এবং তার পথে জিহাদ। বলা হলো, আজাদ করার জন্য সর্বোত্তম গোলাম কে? তিনি বলেন, যার মূল্য সর্বাধিক এবং যে নিজ মনিব পরিবারের অধিক প্রিয়। প্রশ্নকারী বলল, আপনার কী মত? আমি যদি কোনো কাজ করতে সক্ষম না হই? তিনি বলেন, তাহলে কোনো কারিগরের কাজে সাহায্য করো অথবা অনভিজ্ঞ লোকের কাজ করে দাও। সে বলল, আপনি কি মনে করেন, যদি তা করতে আমি অপারগ হই? তিনি বলেন, তোমার অনিষ্ট থেকে লোকজনকে নিরাপদ থাকতে দাও। কেননা তাও সদকা যা তোমার নিজের জন্য করতে পারো। -আদাবুল মুফরাদ: ২২৫
এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। আর সফলতা-ব্যর্থতা নিয়েই মানুষের জীবন। এই ছোট্ট জীবনে সাধ্যানুযায়ী মানুষের উপকার করে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করা কর্তব্য। উপকার করতে নাপারলেও অন্তত অন্যের ক্ষতি করা থেকে নিজেকে বিরত রাখাতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক


