:: কাজী পারভেজ ::
বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমানের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সোশ্যাল মিডিয়া স্ট্যাটাস থেকে একটি বিষয় তুলে ধরা যাক। যদিও তিনি যেভাবে ঢালাওভাবে বলতে চেয়েছেন, আমি ঠিক সেভাবে মনে করি না যে সব মাদ্রাসাতেই এই ধরনের আচরণ ব্যাপক। বিচ্ছিন্ন ঘটনা সবখানেই থাকে। তবে এটাও সত্য যে এই ধরনের বিকৃত আচরণ তথাকথিত হুজুর শ্রেণীর কিছু মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, বলতে কোনো দ্বিধা বা লজ্জা নেই যে ছোটবেলায় যখন আমার বয়স নিতান্তই কম, তখন দুই বার দুই জন হুজুর আমার সাথে এমন কুরুচিপূর্ণ ও বিকৃত আচরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। পাঠক, লেখকের সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাটি নিচে শেয়ার করা হলো:
“কৈশোরে পিতার চাপে পড়ে মাসখানেক কওমি মাদ্রাসায় পড়তে হয়েছিল, ফেনী হোসাইনিয়া মাদ্রাসায়। সঙ্গে ছিল বাল্যবন্ধু আলী ও আমান। এতে আমাদের সুবিধাই হয়েছিল; বাড়ি থেকে দশ টাকা ট্রেন ভাড়া দিয়ে শহরে সিনেমা দেখতে আসাটা তখন সহজ ছিল না। এই মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর দিনে আমরা ক্লাস করতাম, আর সন্ধ্যার পর পাঞ্জাবি ও টুপি পলিথিনের ব্যাগে ভরে, গেঞ্জি গায়ে দিয়ে ফেনী সুরত মহল সিনেমা হলে ছয় টাকার থার্ড ক্লাসের টিকিট কেটে সিনেমা দেখতাম। আমরা থাকতাম হোসাইনিয়া মাদ্রাসার মসজিদে। এক রাতে সিনেমা দেখে চুপিচুপি মসজিদে ফিরলাম। লাইট জ্বেলে দেখি, মাদ্রাসার এক মোদাররেস (শিক্ষক) এক ছাত্রের সঙ্গে সমকামে লিপ্ত! তাও আবার মসজিদের ভেতরেই! আমরা মিনিটখানেক ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। পরে তিন বন্ধু মিলে দুই সমকামীকে গণধোলাই দিলাম। এর পরিণাম হয়েছিল খুব খারাপ। পরদিন আমানকে সিনেমা দেখার অপরাধে মাদ্রাসার মুহতামিম (প্রধান) তাঁর কক্ষের দরজা বন্ধ করে ব্যাপক মারধর করেন। পরের ধাপে আমাকে ও আলীকে মারার জন্য ডাকা হলো। আমি সরাসরি বললাম, ‘আমার গায়ে হাত তুললে আমি কিন্তু মসজিদে আপনাদের লুচ্চামির কথা সবাইকে বলে দেব।’ হুজুর ভয় পেয়ে গেলেন। শেষে সিনেমা দেখার বাহানা দিয়ে তিন বন্ধুকে সেদিনই মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করা হলো। এই ঘটনা আব্বাকে বলার পর তিনি জীবনে আর কখনো আমাদের কওমি মাদ্রাসায় না পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং তিনি জমিয়াতুল মোদাররেসিন থেকে পদত্যাগ করেন।”
এবার একটু হুজুর বা মোল্লা শ্রেণীর দিকে তাকানো যাক। বর্তমানে অনেক মাদ্রাসায় হুজুরদের দ্বারা খাসকামরায় কোমলমতি ছাত্রদের বলৎকারের খবর হরহামেশাই গণমাধ্যমে আসছে। প্রশ্ন হলো, মোল্লারা কি জানে না যে ইসলামে সমকামিতা ও বলৎকার সম্পূর্ণ হারাম এবং ভয়াবহ অপরাধ? তারপরও কেন এমনটা ঘটছে? সহজ বাংলায় বলতে গেলে যৌবনের তীব্র যৌন উত্তেজনা। এই অনিয়ন্ত্রিত কামভাব কিশোর কিশোরী, পীর মোল্লা, সাধারণ মানুষ কিংবা আলেম সবার মধ্যেই তীব্র হতে পারে। এই যৌবনের তাড়না অনেক সময় কোনো রীতিনীতি বা ধর্মের বেড়াজাল মানতে চায় না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজে এত ধর্মীয় অনুশাসন থাকার পরেও লিভ টুগেদার ও সমকামিতার মতো বিষয়গুলো কমছে না কেন?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ও প্রকাশ্যে লিভ টুগেদার চলছে। ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান, নিকেতন, বনানী, বারিধারা এসব এলাকায় অনায়াসেই বাসা ভাড়া পাওয়া যায়, যেখানে বাড়ির মালিক বা কেয়ারটেকাররা খুব বেশি জিজ্ঞাসাবাদ করে না। এর বাইরে মোহাম্মদপুর ও মিরপুর এলাকাতেও অনেকে থাকছেন। একটি বড় অংশ শুধুমাত্র নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য লিভ টুগেদার করেন। আবার কেউ কেউ বিয়ের আগে নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়ার জন্য এটি বেছে নেন। ঢাকার নামী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজের ছাত্র শিক্ষক, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে সাধারণ কর্মচারীরাও লিভ টুগেদার করছেন।
শোবিজে (বিনোদন জগতে) লিভ টুগেদার এখন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে পরিচিত বেশ কয়েকজন তারকা ও নৃত্যশিল্পীর লিভ টুগেদারের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। এমনকি ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষিকাও লিভ টুগেদার করছেন, যা তাঁদের ছাত্রদের কাছেও গোপন নয়। অনেকের ধারণা লিভ টুগেদারের কনসেপ্টটি খারাপ নয়; এতে কেউ কারো বোঝা হয় না, আইনি কোনো জটিল বন্ধন থাকে না এবং ভালো না লাগলে সহজেই আলাদা হওয়া যায়। ক্যারিয়ারের ক্ষতির আশঙ্কায় কিংবা সংসারের ঘানি টানতে না চাওয়ার কারণেও অনেকে এই জীবনধারা বেছে নিচ্ছেন। একাকিত্ব ও জৈবিক তাড়নায় প্রতিষ্ঠিত বহু পরিবারের সন্তানেরাও এখন বিদেশী নাগরিকদের সাথে লিভ টুগেদারে লিপ্ত হচ্ছেন।
তবে লিভ টুগেদারের ক্ষেত্রে সামাজিক ও আইনি বাধা অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যারা এই সম্পর্কে থাকেন, তাদের মনে সবসময় লোকলজ্জা, বাড়ির মালিক, প্রতিবেশী ও পুলিশের ভয় কাজ করে। চড়া দামে বাসা ভাড়া নিতে হয় এবং পুলিশের জন্য ভাড়াটিয়ার তথ্য ফরমে ভুয়া কাবিননামা বা ভুয়া সম্পর্কের তথ্য দিতে হয়। অভিভাবকের মোবাইল নম্বর চাইলে বন্ধুবান্ধবের নম্বর দিয়ে কাজ চালাতে হয়। তরুণদের একটি বড় অংশ ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী। ভারতে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৮ জনেরই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে; বাংলাদেশেও এই হার কম নয়।
বাংলাদেশের আইন ও ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কোনো নারী পুরুষ একত্রে থাকতে চাইলে তাঁদের ধর্মীয় নিয়মনীতি মেনে বিয়ে করতে হবে। বিবাহিত ব্যক্তি যদি অন্য কারো সাথে লিভ টুগেদার করেন, তবে আইনের দৃষ্টিতে শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব যুবসমাজকে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
সময় এসেছে চিন্তা করার, যদি পারস্পরিক সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক হয়, তবে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে লিভ টুগেদারকে একধরণের সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতির আওতায় আনা যায় কি না। লিভ টুগেদার যদি সঠিক নিয়মের মধ্যে আসতো, তবে মোল্লাদের যেমন গোপনে শিশুদের ওপর বিকৃত কাম লালসা চরিতার্থ করার প্রবণতা কমতো, তেমনি তরুণদেরও লুকিয়ে অনৈতিক পথে পা বাড়াতে হতো না। যেহেতু কোনো ধর্মই অবৈধ সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না, তাই দায়িত্বহীন লিভ টুগেদার না করে নামমাত্র দেনমোহরে সহজ বিয়ের আইন করা প্রয়োজন, যেখানে পারস্পরিক সম্মতিতে সহজে বিচ্ছেদের অধিকারও থাকবে। লিভ টুগেদারকে এক প্রকার আইনি চুক্তি বা বিবাহের স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি।


