বাইরে কনকনে ঠান্ডা আর বানভাসি কুহকী জোছনা। বারান্দা ভেদ করে হাসনাহেনার ঘ্রাণ ঢুকে পড়েছে আমাদের বেড রুমেও। সেই রাতে হঠাৎ করে তার অনিন্দ্যসুন্দর মুখটা আমার বুকে গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। সে কী কান্না তার! কোনো কথা নয়, শুধু কান্না আর কান্না। তার বুকের ধুকধুক স্পন্দন মিশে গিয়েছিল আমার হৃদয়বীণার সুরে। আমি কান পেতে শুনেছিলাম সে সুর। ভেসে যাচ্ছিলাম।
ভেবেছিলাম বুকভাঙা সেই স্পন্দন আমার জন্য। করতলে তার কান্নাভেজা মুখটা তুলে নিয়ে জানতে চাইলাম তার না বলা কথাগুলো, শুনতে চাইলাম তার অন্তরের নিগুঢ়তম বার্তা-‘ভালোবাসি’ কথাটা। নাহ, সে সৌভাগ্য আমার হয়নি। সে কান্না ছিল হয়তো আমার জন্য করুণা কিংবা মায়া, সে কান্না ছিল আমাকে ছেড়ে যাবার আগে তাঁর শেষ নৈবেদ্য।
একসময় নীলকান্তমণি আমার কাছ থেকে নিজেকে আস্তে ছাড়িয়ে নিলো। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আমাকে বলতে শুরু করলো, ‘মেয়েটা তো দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। সে কি খেতে পছন্দ করে, কোথায় তার সবকিছু থাকে কিছুই তো জানো না।’
আমি বললাম, এগুলো দেখার জন্য তো তুমিই আছো।’
কোনো প্রতিউত্তর না দিয়ে তোর কাপড় চোপড় কোথায় কি থাকে সব দেখাতে লাগলো। তুই কী কী খেতে পছন্দ করিস তাও বললো। জানিস, তাও আমার একটুও খটকা লাগেনি। একটু চোখ লেগে আসছিল। এক ঘুমে সকাল হলো। হঠাৎ খাটের পাশের সাইড টেবিলে বই চাপা দেয়া একটা চিঠি পাই। চিঠিটা তার লেখা।’
আবিদ, ক্ষমা চাইব না। সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় না। নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়ায় হেরে গেছি। যাকে ভালোবাসতে পারিনি তাকে কষ্ট দেবার অধিকারও নেই। অধিকার ও ভালোবাসা একে অন্যের পরিপূরক। চেষ্টা করেছিলাম। ‘আর কতটা ঠকাব তোমাকে’ এই ভেবে দিনের পর দিন নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। আমার তাহিয়া পাখিটারই বা কী দোষ! ওকে কেন পৃথিবীতে এনেছিলাম! উত্তর খুঁজে পাইনি। তোমারই বা কী দোষ ছিল। কী দোষ ছিল সৈকতের! পৃথিবীর সবাই তো আর ক্যাডার সার্ভিস করবে না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হবে না।
সৈকত ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার নয, এটা ছিল ওর অপরাধ। আর আমার অপরাধ ছিল মা-বাবাহীন একটা অযোগ্য এতিম ছেলেকে ভালোবেসেছিলাম।
আমার বিয়ের খবর শুনে সৈকতের সে কী কান্না! আজো ভুলতে পারিনি। সেই দৃশ্য আমাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে এতটা বছর। একজন পুরুষ মানুষ এভাবে কাঁদতে পারে আমার জানা ছিল না।
সৈকত আর সংসারী হতে পারে নি। আমাকে ভালোবেসে সে অন্যায় করেনি নিশ্চয়ই। কথা দিয়েছিলাম, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও ওকে ছেড়ে কোথাও যাব না। কিন্তু বাবার সাথে পারিনি। জানি, বাবার আত্মা কষ্ট পাবে। তবুও আমি অপারগ। অনেক চেষ্টা করেছি বাবার মুখ চেয়ে। তোমার মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে। কিন্তু একটা কথা বোঝ নিশ্চয়ই। ছক মেনে জীবন চলে না। নিয়মে বাঁধা নয় জীবনের নিয়ম। অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ঘটনা জীবনে হঠাৎ করে ঘটে যায়। বাবার দাম্ভিকতার বলি হয়েছিলাম আমি। এই আর কী!
তোমাকে বলে গেলেও হয়ত তুমি আমার পথ আটকাতে না। কিন্তু তোমাকে আমার প্রতারক মুখটা আর দেখাতে ইচ্ছে হলো না। বাবার একগুঁয়েমিতে চার চারটে জীবন এলোমেলো হয়ে গেল।
যাই হোক, তুমি চাইলে তাহিয়াকে আমি নিয়ে আসব। সৈকতের কোনো আপত্তি নেই। তাহিয়াকে যদি ফেরত না দাও, মাঝে মধ্যে চোখের দেখাটুকু অন্তত দেখতে দিও।
সমাজ আমাকে ক্ষমা করবে না জানি। শুধু তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। ভালো থেকো। অনেক অনেক ভালো।


