ছয় মাস পেরোলেও চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে ৫১ জনের প্রাণহানির ঘটনার মামলার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এরই মধ্যে আবারও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ডিপোটিতে।
সীতাকুণ্ডের কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার ফিরোজ মিয়া বলেন, মঙ্গলবার (১৩ ডিসেম্বর) বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে ডিপোর ভেতরে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে আমাদের দুইটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে লেগেছে। বর্তমানে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলতে কাজ করছি। আগুনের সুত্রপাতের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি পরে জানাতে পারবো।
এদিকে আগের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিকপক্ষকে বাদ দিয়ে মামলায় আট কর্মকর্তাকে আসামি করা হলেও, এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। থানা পুলিশ থেকে এক মাস আগে তদন্তভার পেয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। মামলার অগ্রগতি না থাকলেও গত নভেম্বরে বিএম কনটেইনার ডিপো লিমিটেডের কার্যক্রম শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
দায়ী ব্যক্তিদের বিচার হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ও বিশিষ্টজনরা। সিনিয়র আইনজীবী ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘দেশে গণতান্ত্রিক আইনের শাসনের ঘাটতির কারণে বিচার পাওয়া নির্ভর করে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর। যারা মারা গেছে, তারা আমজনতা। সুতরাং প্রভাবশালী কেউ মারা গেলে বিচার পাওয়া যেত। আর ডিপোর ঘটনায় দায়ীরা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি। ফলে এখানে কর্মচারীদের আসামি করে মামলাটি করা হয়েছে। মালিকপক্ষ বা যারা দায়ী, তাদের আসামি করা হয়নি। অভিযোগপত্রেও আধো দায়ীদের আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কিনা নিশ্চিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার শুরু থেকেই দেখা গেছে, সঠিক বিচার না হওয়া। বিচার তো পরে, মামলা রুজু, আসামি করা, তদন্তে বাকিটা বের করে আনা, কিছুই তো হচ্ছে না। এ জাতীয় প্রভাবশালীদের দ্বারা সংঘটিত ঘটনাগুলোতে যা হয় সচারচর বিএম ডিপোর ঘটনাতেও তাই হচ্ছে।’
গত ৪ জুন রাতে ভয়াবহ আগুনের পর বিস্ফোরণে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়িতে বিএম ডিপোতে ৫১ জন নিহত হন। আহত হন দেড় শতাধিক। এ ঘটনায় গত ৭ জুন সীতাকু- থানার উপপরিদর্শক আশরাফ সিদ্দিকী মামলা করেন। মামলায় ডিপোর আট কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
আসামিরা হলেন ডিপোর মহাব্যবস্থাপক নাজমুল আক্তার খান, উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) নুরুল আক্তার খান, ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খালেদুর রহমান, সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্বাস উল্লাহ, জ্যেষ্ঠ নির্বাহী (প্রশাসন) নাছির উদ্দিন, সহকারী ব্যবস্থাপক আবদুল আজিজ, ডিপোর শেডের ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম ও সহকারী ডিপো ইনচার্জ নজরুল ইসলাম।
বিস্ফোরণে ডিপোর একাংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দুর্ঘটনায় রপ্তানি পণ্যবাহী ১৫৪ কনটেইনার ও আমদানি পণ্যবাহী দুটি কনটেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, কাস্টমস, বন্দর ও ফায়ার সার্ভিসসহ অন্তত পাঁচটি তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। মামলা পর থেকে মামলাটি তদন্ত করে সীতাকু- থানা পুলিশ। দীর্ঘ ৫ মাস তদন্ত করেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার ও মামলার তেমন অগ্রগতি হয়নি।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘আমি সীতাকুণ্ডে নতুন যোগদান করেছি। প্রথম দিকে থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করলেও, মাসখানেক আগে জেলা ডিবি পুলিশে এটি হস্তান্তর করা হয়।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোস্তাক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘মামলাটি এক মাস ধরে তদন্ত করছি, কাজ চলছে। ঘটনার পর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। নমুনার ফল পেয়ে কিছু লাশ হস্তান্তর করেছি। কিছু লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল মর্গে আছে। ডিএনএ রিপোর্ট পেলে বাকিগুলো স্বজনদের বুঝিয়ে দেয়া হবে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডিএনএ প্রতিবেদনের অপেক্ষায় হিমাগারেই রয়েছে আটটি মৃতদেহ। তবে প্রতিবেদন পাওয়ায় এরই মধ্যে ১৩ লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে স্বজনদের কাছে। সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ প্রোফাইল সম্পন্ন করে গত ৭ জুলাই আটটি লাশের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল। ১৬ সেপ্টেম্বর আরও তিনজনের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
সীতাকু- ফায়ার সার্ভিসের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা নুরুল আলম দুলাল বলেন, ‘ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনায় আমাদের ১০ কর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জন সীতাকুণ্ড ফায়ার সার্ভিস ও কুমিরার এক সদস্য রয়েছেন। তাদের ডিএনএর নমুনা নেয়া হয়েছে। নমুনার ফল এখনো পাওয়া যায়নি।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্বরত জেলা পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আলাউদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘বিএম ডিপোর ঘটনায় যাদের মরদেহ পুড়ে যাওয়ার কারণে শনাক্ত করা যায়নি ও বিভিন্ন সময়ে মানবদেহের যেসব খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করা হয়েছিল, সেগুলোকে আমরা একেকটি লাশ হিসাবে ধরে ডিএনএ প্রোফাইল করতে ২১ জনের তথ্য পাঠিয়েছিলাম। তার মধ্যে আটটি লাশের ডিএনএ ফল এখনো পাওয়া যায়নি। লাশগুলো বা দেহাবশেষ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের হিমাগারে রয়েছে। ডিএনএ প্রোফাইলের ফল পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে বুঝিয়ে দেয়া হবে।’
বিএম ডিপো ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, বিস্ফোরণের প্রায় পাঁচ মাস পর নভেম্বরে বিএম কনটেইনার ডিপো লিমিটেডের আমদানি-রপ্তানি পণ্য ব্যবস্থাপনা পুরোদমে শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনার পর ডিপো ব্যবহার করে আমদানি-রপ্তানি ও খালি কনটেইনার সংরক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। ডিপো সংস্কার করার পর গত ২২ আগস্ট শুধু খালি কনটেইনার সংরক্ষণের অনুমোদন দেয় কাস্টমস।
গত ২৫ অক্টোবর ৯ শর্তে পোশাকপণ্য রপ্তানি কার্যক্রম ব্যবস্থাপনার অনুমোদন দেয়া হয়। শর্ত পরিপালন করায় গত ৭ নভেম্বর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুরোদমে শুরুর অনুমোদন দেয়া হয়। তবে বিএম ডিপো রাসায়নিক পণ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশের স্মার্ট গ্রুপ ও নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠান মিলে চালু করে বিএম ডিপো। এ ডিপোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। পরিচালক হিসেবে আছেন স্মার্ট জিনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান।


